◉ ভুমিকা
২৮ মার্চ ২০২৫, শুক্রবার, স্থানীয় সময় দুপুর ১২ঃ২০। মিয়ানমারসহ আশে পাশের দেশগুলি কেঁপে উঠে মায়ানমারের মান্ডালের অন্তর্গত জাগাইং শহরে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে। এতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন এবং অসংখ্য স্থাপনা ধসে পড়েছে।
Table Of Content
ভয়াবহ এ ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মান্ডালে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ১০০০ কিলোমিটার দুরে থাইল্যান্ডে কম্পন অনুভুত হয়, ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশী আলোচিত হচ্ছে ৩০ তলা নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়া নিয়ে।
ভূমিকম্পের উৎস, ক্ষয়ক্ষতি কোথায় কেন হল এবং এতে বাংলাদেশের জন্য কি কি শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে তা নিয়ে এই প্রবন্ধ।
◉ ভূমিকম্পটির উৎস, মাত্রা এবং বৈশিষ্ট্য
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল মান্ডালের জাগাইং হলেও এটি মান্ডালে থেকে টাউঙ্গু পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটি স্লিপ ফল্ট লাইনের দুই পাশে দুই প্লেটের নড়াচড়ার কারনে সংগঠিত হয়েছে। পৃথিবীর উপরের স্তরটি বিভিন্ন অংশে বিভক্ত, যাকে বলা হয় টেকটোনিক প্লেট, যেগুলো সবই ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। কিছু একে অপরের পাশাপাশি নড়াচড়া করে, আবার কিছু একে অপরের উপরে বা নীচে পরস্পরের দিকে সরতে চায়। এই গতিবিধিই ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে।
মিয়ানমারকে বিশ্বের ভূতাত্ত্বিকভাবে “সক্রিয়” অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয় কারণ এটি চারটি টেকটোনিক প্লেট – ইউরেশিয়ান প্লেট, ভারতীয় প্লেট, সুন্দা প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের অভিসরণস্থলের উপরে অবস্থিত। ৪০-৫০ মিলিয়ন বছর আগে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে ভারতীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে। বার্মা মাইক্রোপ্লেটের নীচে ভারতীয় প্লেট সরে যাওয়ার ফলে ২০০৪ সালে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল।
জাগাইং ফল্ট নামে একটি বড় ফল্ট রয়েছে, যা মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত এবং ১,২০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ। শুক্রবারের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ ছিল “স্ট্রাইক-স্লিপ” – যেখানে দুটি প্লেট একে অপরের সাথে সমান্তরালে এবং অনুভুমিকভাবে কিন্তু বিপরীত দিকে সরে যায়। প্লেটগুলো একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যাওয়ার সময় ঘর্ষণ শক্তির কারনে আটকে যায়। ঘর্ষণ শক্তির সীমা যখন অতিক্রম করে যায় তখন হঠাৎ ছেড়ে দেয় এবং প্লেট দুটি হঠাৎ সরে যায়, যার ফলে ভূমিকম্প হয়।

◉ ভূমিকম্প এত দূরে কেন অনুভূত হয়েছিল?
ভূপৃষ্ঠের ৭০০ কিলোমিটার নীচ পর্যন্ত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হতে পারে। মান্ডালে ভুমিকম্প ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার নিচে ছিল, এরকম অগভীর ভূমিকম্পে ভূপৃষ্ঠে কম্পনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। ভূমিকম্পটিও বড় ছিল – রিখটার স্কেলে ৭.৭ মাত্রার। পরাঘাত ছিল ১২ মিনিট পর ৬.৭ মাত্রার। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুসারে, প্রধান কম্পনটি ছিলো হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ২০০ কিলোমিটারের বেশী দীর্ঘ ফল্ট লাইন বরাবর এই ভূমিকম্প হওয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উত্তর-দক্ষিণ বরাবর অধিক অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। এই ফল্ট লাইনটি দক্ষিণে মাটির নিচে থাইল্যান্ডের দিকে ১২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত যার কারণে মিয়ানমারের পরে থাইল্যান্ডে সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়েছে।
ভূপৃষ্ঠে ভূমিকম্প কত মাত্রায় আঘাত করবে তা মাটির ধরণ দ্বারাও নির্ধারিত হয়। ব্যাংককের মাটি নরম কাদা যেখানে ভূমিকম্পের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ভাষায় এমপ্লিফিকেশন (amplification) বলে। তাই, ব্যাংককের ভূতত্ত্বগত গঠন ভূমিকম্পের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে।
সারমর্ম হলো, ফল্ট লাইনের বিস্তৃতি এবং নরম কাদামাটির স্তরের কারনে দুরে হওয়ার পরেও থাইল্যান্ডে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাংকক থেকে কাছে হলেও প্লেটের সরনের দিকের সাথে বাংলাদেশের দিক ছিল ৯০ ডিগ্রী। যার কারণে কম্পন অনুভূত হলেও মাত্রা কম ছিল বাংলাদেশে।
◉ ব্যাংককে কেন কেবল একটি আকাশচুম্বী ভবন ধসে পড়ল?
ভূমিকম্পের সময় ব্যাংককের উঁচু ভবনগুলো দুলছে, বিভিন্ন ভবনের ছাদের পুল থেকে পানি পড়ছে – এরকম ভিডিও ফুটেজ দেখা গেছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। তবে, ব্যাংককের চাতুহাক জেলার অডিটর-জেনারেলের অফিসের নির্মাণাধীন সদর দপ্তরটিই ধসে পড়া একমাত্র আকাশচুম্বী ভবন বলে মনে হচ্ছে – এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী। এখানে বলে রাখা ভাল যে, সাধারণত আকাশচুম্বী ভবনগুলী ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণগুলো হলো, (১) এসব ভবন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা ডিজাইন করা হয় (২) কনট্রাক্টর নিয়োগ দেয়া হয় অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতা যাচাই করে নামী দামী প্রতিষ্ঠানকে (৩) ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি এবং ভবনের ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে পার্থক্য বেশি থাকার কারনে অনুনাদ (resonance) হয় না (৪) বেশিরভাগ আকাশচুম্বী ভবন তুলনামূলকভাবে নতুন, ফলে বয়সের কারনে ম্যাটেরিয়ালের মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি কম।
থাইল্যান্ডের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক আমর্ন পিমার্নমাস বলেন, ভূমিকম্পসহনীয় ভবনের বিষয়ে ৪৩ টি প্রদেশে নিয়মকানুন থাকলেও, ১০% এরও কম ভবন ভূমিকম্পসহনীয় বলে অনুমান করা হয়। কিন্তু, যে ভবনটি ধসে পড়েছে তা ভূমিকম্পের সময় নির্মাণাধীন ছিল এবং হালনাগাদ বিল্ডিং কোড মেনে ডিজাইন করার কথা, যা তদন্তের পর জানা যাবে।
ডঃ পিমার্নমাস বলেন, ব্যাংককের নরম মাটিও এর পতনের পেছনে ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ এটি ভূমিকম্পের মাত্রা তিন থেকে চার গুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিন্তু, এই কারণটি আমার কাছে যুক্তিতে টিকে না, কারণ তাহলে আশে পাশের অনেক ভবন ধ্বসে পড়ার কথা, তা হয় নি। এমপ্লিফিকেশন হয়েছে অবশ্যই, তাই তো সবাই তীব্র কম্পন অনুভব করেছে। তারপরও ব্যাঙ্ককে কম্পনের মাত্রা ৩-৪ এর মধ্যে ছিল। তিনি আরও বলেন, “অন্যান্য কারণও থাকতে পারে, যেমন কংক্রিটের গুণগত মান এবং কাঠামোগত ব্যবস্থায় কোন ডিজাইন ত্রুটি। এগুলি এখনও বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা বাকি।” এটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
চায়না অবজারভারের ভিডিও দেখে বুঝতে পারলাম, ভবন নির্মাণ হচ্ছিল প্রিকাস্ট স্ল্যাব দিয়ে। অর্থাৎ, কলাম (পিলার), বীম, কনক্রিটের শিয়ার ওয়ালের কোর নির্মাণের পর প্রিকাস্ট স্ল্যাব অন্যত্র ঢালাই করে ক্রেন দিয়ে চার বীমের মাঝখানে বসিয়ে দেয়া হয়। ফাঁপা কোর স্ল্যাবগুলিকে বিমের সাথে একীভূত করার জন্য সঠিক লোড ট্রান্সফার এবং কাঠামোগত অখণ্ডতা নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক, যা অতিরিক্ত সংযোগ রড, শিয়ার কানেক্টর এবং প্রিকাস্ট স্ল্যাবের উপর রডসহ কংক্রিট ঢালাই – ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জন করা হয়। ভবনটির মেইন স্ট্রাকচার সম্পন্ন হওয়ার পরেও মোট কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০% নির্দেশ করে ভবনটির প্রিকাস্ট স্ল্যাবগুলিকে মেইন স্ট্রাকচারের সাথে যথাযতভাবে সংযোগ করার কাজটি হয়ত সম্পন হয় নি। যার কারনে, স্ল্যাবগুলো শুধু বোঝা হিসেবে কাজ করেছে, ভূমিকম্পের লোড সবগুলো কলাম এবং শিয়ার ওয়ালে ট্রান্সফারের কাজটি করতে পারেনি।
পুরো ভবনের ভূমিকম্পের আগের ছবিতে আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় ছিল, ভবনের নীচে ডাবল বা ট্রিপল উচ্চতার কিছু কলাম যা ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হাইওয়ে থেকে ধারন করা বিবিসি এর ওয়েবসাইটে প্রচারিত একটি ভিডিওতে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল ভবনের নিচ তলার সকল কলাম এবং শিয়ার ওয়াল এক সাথে ফেইল করার কারণে পুরো ভবন একসাথে সোজা নিচে ধসে পড়ে। একপাশে কয়েকটা কলাম ফেইল করলে ধসের ধরনটা অন্যরকম হত।
চীনে ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধসে পড়া ভবনটি একটি কোর টিউব এবং ফ্ল্যাট স্ল্যাব সিস্টেম দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছিল। কোরটি স্লিপফর্ম কাস্টিং ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল, যখন ফ্ল্যাট স্ল্যাবগুলি একটি উত্তোলন পদ্ধতি ব্যবহার করে ইনস্টল করা হয়েছিল। অতিরিক্ত উচ্চতায় কংক্রিটের মান নিশ্চিত করার জন্য বহিরাগত কাঠামোতে একটি ক্লাইম্বিং ফর্মওয়ার্ক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে বলতে হবে, এটা একটা বড় ধরনের ডিজাইন ত্রুটি এই ধরনের আকাশচুম্বী ভবনের ক্ষেত্রে।
সবকিছু মিলালে, এটা পরিস্কার হয় যে, তড়িগড়ি করে ভবনটির মেইন স্ট্রাকচারটি সম্পন্ন করে প্রিকাস্ট স্ল্যাবগুলোকে মেইন স্ট্রাকচারের সাথে যথাযতভাবে সংযোগ না করার কারনে ভবনটি ধ্বসে পড়ার মূল কারণ বলে প্রতিয়মান হয়। তার সাথে যোগ হতে পারে, ডিজাইন ত্রুটি, নির্মাণ ত্রুটি, কনক্রিটের গুনগত মান এবং রডের অযথাযত সাজানো।
বাংলাদেশের রাজধানীর প্রথম ঢাকা এলেভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কন্ট্রাকটর হলো ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইটিডি), চীনের শানডং হাই-স্পিড গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (এসডিএইচএস) এবং পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন অফ চায়না (সিনোহাইড্রো) এর জয়েন্ট ভেঞ্চার। ৩০ তলা ভবনের কন্ট্রাক্টর ছিল ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইটিডি) এবং চায়না রেলওয়ে নাম্বার টেন লিমিটেড এর জয়েন্ট ভেঞ্চার। এলেভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ডিজাইন ভূমিকম্পসহনীয় কিনা যাচাই করে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। স্ট্রাকচারটা দেখে ডিজাইন যথার্থ কিনা সন্দেহ তৈরী হয়।
◉ বাংলাদেশে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কতটুকু?
বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপি গবেষণা রিপোর্টগুলো স্টাডি করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বড় প্লেট বাউন্ডারিগুলো, বাংলাদেশের ভিতরে এবং অতিনিকটের ফল্ট লাইনগুলোর কারণে ১০০ থেকে ১৫০ বছর অন্তর ৭ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ৮ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্পও হতে পারে যা ২৫০ – ১০০০ বছর পর পর ফিরে আসে। বাংলাদেশের মধ্যে ও আশেপাশে ৭ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ছিলঃ
- কাচার ভূমিকম্প (১৮৬৯)ঃ কেন্দ্র ছিল সিলেটের সিলচরে, মাত্রা ৭.৪ ।
- বেঙ্গল ভূমিকম্প (১৮৮৫)ঃ কেন্দ্র ছিল মানিকগঞ্জে, মাত্রা ৭.০।
- শ্রিমঙ্গল ভূমিকম্প (১৯১৮)ঃ কেন্দ্র শ্রিমঙ্গল, মৌলভিবাজার। মাত্রা ৭.৬।
- মেগালয় ভূমিকম্প (১৯২৩)ঃ মাত্রা ৭.১।
- ধুবড়ি ভূমিকম্প (১৯৩০)ঃ কেন্দ্র ধুবড়ি, আসাম, ভারত। মাত্রা ৭.১।
বাংলাদেশ ও এর আশে পাশে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের গ্রেট আরাকান ভূমিকম্প যার মাত্রা ছিল ৮.৫। এরপর ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত হয়েছিল ৮.০/৮.৭ মাত্রার গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প যার কেন্দ্র শিলং, ভারত। আসামে ১৯৫০ সালে সংঘটিত হয় আরেকটি ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প।
এসব অতীত ভূমিকম্পগুলো নির্দেশ করে বাংলাদেশে এবং এর আশেপাশের অতি নিকটে ৭ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প আসন্ন কারণ বিগত ১০০ বছরের মধ্যে এ মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। এখনও হতে পারে আবার ১০-২০ বছর পরও হতে পারে। তবে, এটা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। ৮ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হয়ত আরো ৫০-২০০ বছর পরে হতে পারে।
◉ ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হবে?
রানা প্লাজা ধ্বসের পরে বিদেশী ক্রেতাদের চাপে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ভবনগুলো নিরাপদ কিনা যাচাই করা হয়। তাতে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভবন ডিজাইন এবং নির্মাণ ত্রুটির কারণে ব্যয়বহুল মেরামত এবং শক্তিবৃদ্ধিকরণ করতে হয়েছে, তাতে অনেক মালিক লোকসানে পড়েছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়েছে অথবা অতিরিক্ত মূলধন যোগান দিতে হয়েছে।
ঢাকা শহর এবং এর আশে পাশের এলাকাগুলোতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের লোনে রাজউকের তত্ত্বাবধানে বিদেশী এবং দেশি পরামর্শকদের দ্বারা আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (URP=Urban Resilience Project=নগর সক্ষমতা প্রকল্প) সম্পন্ন করেছে প্রায় ৬০০ কোটি ব্যয় করে। এর অধীনে যে পরিমাণ পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়েছে, রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে এবং সাজেশন দেয়া হয়েছে – তার সবগুলো বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহর ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় অনেক এগিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এই প্রজেক্টের অধীনে একটা সাবপ্রজেক্ট ছিল রাজধানীর ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই করা। তাতে দেখা গেছে অধিকাংশ ভবন ডিজাইন এবং নির্মাণ ত্রুটির কারণে ভূমিকম্পসহণীয় নয়।
আমি যখন ব্যক্তিগত এবং প্রফেশনাল কাজে বিভিন্ন জেলায় সাইট ভিজিটে যাই, তখন রাস্তার দুপাশে নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কলাম, বীম এবং স্ল্যাবগুলো লক্ষ করি। প্রচুর ভবন ফ্লাট স্ল্যাব এবং কলাম দিয়ে তৈরি হচ্ছে। এ ধরণের ভবন ডিজাইনে শিয়ার ওয়াল ব্যবহার করে, কলামের সাইজ বাড়িয়ে এবং স্ল্যাবের পুরুত্ব বাড়িয়ে ডিজাইন করতে হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অনেক ভবন দেখি যেগুলোতে চিকন চিকন কলাম এবং বীম দিয়ে তৈরী হচ্ছে। এই ভবনগুলো হয় অনভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার অথবা মিস্ত্রী দিয়ে মালিকের নির্দশনায় তৈরী হচ্ছে। এসব ভবনের ফাউন্ডেশনের অবস্থা বলাই বাহুল্য। মিরপুরে একটা বিশাল ১৪ তলা ভবনের এক পাশে ১২ ইঞ্চি বসে গেছে কিছুদিন আগে। এসব ভবন ভূমিকম্পের সময় মূহুর্তের মধ্যেই ধসে পড়বে সেটা বুঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ডিজাইন চেকিং করতে গিয়ে দেখেছি,
- অনেক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইনে পারদর্শী নয়, বিল্ডিং কোড সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখে না।
- অধিকাংশ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশের গভীর নরম মাটিতে ভূমিকম্পসহনীয় ফাউন্ডেশন ডিজাইন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারনা রাখেন না। যেমন, উত্তরা ৩য় প্রকল্প, বসুন্ধরা, জলসিড়ির গভীর নরম মাটিতে চিকন লম্বা পাইলের উপর ১০ তলা ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
- অধিকাংশ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার লিকুইফ্যাকশন উপযোগী নরম বালি মাটিতে ফাউন্ডেশন ডিজাইনের প্রশিক্ষণ পায়নি। নরম বালি মাটি যা ভূমিকম্পের সময় লিকুইফ্যাকশন হয়ে তরল পদার্থের মত হয়ে যায়। এরকম মাটিতে বিল্ডিং ডিজাইন সতর্কতার সাথে করতে হয়।
- অধিকাংশ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার এবং নির্মাণ শ্রমিকরা ভূমিকম্পসহনীয় রড সাজানোর নিয়ম কানুন জানেন না।
- আর্কিটেক্টরা মেজানাইন এবং ডাবল-ট্রিপল উচ্চতার পিলার পছন্দ করেন। মালিকরা পছন্দ করেন, কারণ, দেখতে ভাল লাগে। এক্ষেত্রে ডিজাইনে অতি সতর্কতার সাথে করা না হলে, ভূমিকম্প ঝুঁকি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
- প্রিকাস্ট পাইলগুলো লিকুইফ্যাকশন উপযোগী মাটি ভেদ করে হার্ড লেয়ারে ঢুকানো সম্ভন হয় না, এক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময় এসব ভবন ফাউন্ডেশনের দুর্বলতার কারণে ধসে পড়বে।
- কাস্ট ইন সিটু পাইলগুলো নির্মাণ ত্রুটির কারণে পাইলের তলার মাটি নরম থেকে যায়। ফলে, ভূমিকম্পের সময় অধিক লোড আসার কারণে ভবন কাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- জেলা শহর এবং গ্রামে-গঞ্জে অভিজ্ঞ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারের অভাবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ডিজাইন ছাড়া অথবা অনভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ডিজাইন করা হয়।
বাংলাদেশের বেশীর অঞ্চলের মাটি হয় নরম কাদা অথবা লিকুইফ্যাকশনপ্রবণ নরম বালি। এসমস্ত মাটিতে ফাউন্ডেশন এবং স্ট্রাকচার ডিজাইনে বিল্ডিং কোড মানার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা অথবা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দরকার। ঢাকা শহরে অনেক হাউজিং প্রজেক্ট আছে যেগুলোতে নরম কাদার উপর ড্রেজিং করে বালি ভরাট করার মাধ্যমে ডেভেলপ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নরম কাদার কারণে ভূমিকম্পের মাত্রা কয়েকগুন বৃদ্ধি পায় আবার লিকুইফ্যাকশনপ্রবণ নরম বালির কারনে মাটির ভারবহন ক্ষমতা থাকে না।
সব মিলিয়ে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ৭ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে, যে ক্ষয়ক্ষতিগুলো হতে পারে তা হলোঃ
- বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা এবং রেল লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারন এগুলো নরম কাদা অথবা নরম বালির উপর তৈরী করা। অনেকক্ষেত্রে, ঠিকমত কম্প্যাকশন করা হয় নি।
- অনেক ব্রিজ ভেঙ্গে পড়বে অথবা ব্রিজের এপ্রোচ ধসের কারনে ব্রিজ ব্যবহার করা যাবে না মেরামত না করা পর্যন্ত।
- গ্যাস লাইন, পানির লাইন লিক করতে পারে।
- বেশীরভাগ ভবন হয় ভেঙ্গে পড়বে অথবা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যাবে।
শহরগুলোতে যেখানে রাস্তা সরু, সেখানে উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত কঠিন হবে।
◉ ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমাদের করণীয়ঃ
ভূমিকম্পের কোন আগাম সতর্কতা জারি করা যায় না। আমরা জানিনা কোন মূহুর্তে ভূমিকম্প হবে। আমরা শুধু বলতে পারি ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু। ভূমিকম্প প্রতিহত করার কোন ব্যবস্থা নেই। আমরা করতে পারি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠিকে থাকবে এরকম ভূমিকম্পসহনীয় স্থাপনা। স্থাপনার ধরন অনুযায়ী সেই মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। যেমন, পাওয়ার প্লান্ট যেই মাত্রার জন্য ডিজাইন করা হয়, আবাসিক ভবন সেই মাত্রার জন্য করা হয় না। কেউ চাইলে করতে পারে, কিন্তু অনেক ব্যয়বহুল হবে বিধায় কেউ করে না। আমরা চাই, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হসপিটাল যেন ভূমিকম্পের সময় কোন মতেই ধসে না পড়ে। আমাদের ভবনগুলোতে রড এমনভাবে সাজাতে হয় যাতে, বড় ভূমিকম্পে ভবন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হলে কোনমতেই ধসে না পড়ে। তাতে জীবন রক্ষা পাবে, পরবর্তীতে সামান্য মেরামতের মাধ্যমে ভবন আবার ব্যবহারযোগ্য হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প মানুষ মারে না, মানুষ মরে তাদের নির্মিত ত্রুটিযুক্ত ভবনের নিচে চাপা পড়ে। তাই, আমাদের উচিত ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে সচেতন হওয়া।
ভূমিকম্পসহনীয় স্থাপনা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যা করা উচিতঃ
- ডিজাইন অনুমোদনঃ গ্রাম থেকে শহরে যেখানেই বিল্ডিং করা হোক, বিল্ডিং কোড (Bangladesh National Building Code 2020) মেনে ডিজাইন করতে হবে। এটা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনিক সংস্কার এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন বা উন্নয়ন কতৃপক্ষগুলোতে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেক্ট নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, যারা বিল্ডিং এর ডিজাইন অনুমোদন দিবেন, তাদের অবশ্যই দক্ষ এবং অভিজ্ঞ হতে হবে। মনে হতে পারে এতে সরকারে ব্যয় বেড়ে যাবে। আসলে সরকারের ব্যয় বাড়বে না, বরং রাজস্ব আয় বেড়ে যাবে। কারণ, অনুমোদনের জন্য এমন ফি নির্ধারিত করতে হবে যা থেকে কতৃপক্ষের জনবলের বেতন দেয়া যাবে। তবে, সরকার নির্ধারিত ফি এর বাইরে যাতে আর কোন অতিরিক্ত উৎকোচ দেয়া না লাগে সেটা করতে পারলে, একটা বিশাল অর্জন হবে। পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে ভবনের ডিজাইন ড্রয়িং একটি নিবন্ধিত ডিজাইন ফার্ম দিয়ে করতে হবে এবং আরেকটি নিবন্ধিত ফার্ম দিয়ে চেক করতে হবে। এরকম অনেকগুলো ফার্ম নিবন্ধিত করতে হবে তাদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে।
- পুরনো ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে ভবন মালিকদেরকে নোটিশ দিতে হবে, হয় ভেঙ্গে ফেলুন না হয় ভবনের শক্তি বৃদ্ধি করুন। সরকারিভবনগুলো সবার আগে এর আওতায় আনা উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ফায়ার ব্রিগেড, পাওয়ার প্লান্ট, সরকারি সব গুরুত্বপূর্ণ অফিস ইত্যাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপদ কিনা যাচাই করে হয় ভেঙ্গে নতুন ভবন করা অথবা পুরনো ভবনের শক্তিবৃদ্ধি করতে হবে। প্রথমে ২০ বছরের অধিক পুরনোগুলো এর আওতায় এনে তারপর ১০-২০ বছর পুরনো এবং সবশেষে ১-১০ বছর পুরনো ভবনগুলো এর আওতায় আনতে হবে।
- শহরগুলোতে আগামী ৫০ বছরের উন্নয়ন, শহর বর্ধন মাথায় রেখে জমিগুলো কতৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, রাস্তা এবং প্লটিং করে জমির মালিকদেরকে বরাদ্দ দিতে হবে তাদের জমির আনুপাতিক হারে। এটা একটা বিশাল কাজ। এর জন্য প্রয়োজন অনেক চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা। অন্যথায় সরু রাস্তার দুইপাশে বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। ঢাকাসহ সব শহরগুলোতে এটা লক্ষ্যনীয়।
- আর্কিটেক্ট, প্ল্যানার এবং ইঞ্জিনিয়ারদের প্রফেশনাল বডি (IAB, IEB etc.) অথবা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ডিজাইন এবং কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সরকারের একটা বাজেট থাকতে পারে অথবা যারা প্রশিক্ষণ নিবেন তাদের কাছ থেকে ফি নিয়ে কম বাজেটে সম্পন্ন করা সম্ভব।
- প্রতিবছর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার নিবন্ধনের ব্যবস্থা করলে এবং সেই নিবন্ধিত ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ ডিজাইন করতে পারবে না – এরকম নিয়ম কঠোরভাবে পালন করলে, ডিজাইনে ত্রুটি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। নিবন্ধিত ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকে সরকার প্রতিটি ভবনের ডিজাইনের জন্য প্রতি বর্গফুটে একটা নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স এবং ভ্যাট নিতে পারে। এই রাজস্ব আয় থেকে ফ্রেশ ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরী করে বেকারত্ব কমানোর ব্যবস্থা নিলে দুদিকেই লাভ। টেকসই উন্নয়ন এবং বেকারত্ব হ্রাস।
- বড় শহরগুলোতে প্লানিং এর ক্ষেত্রে মাটির অবস্থা এবং সাইজমিক মাইক্রোজোনেশন বিবেচনায় নিলে ভূমিকম্প ঝুঁকি কমবে।
◉ উপসংহার
ভূমিকম্প মানুষ মারে না, আমরা মরি আমাদের নির্মিত ভবনের নিচে চাপা পড়ে। শুধু বিল্ডিং কোড (Bangladesh National Building Code 2020) মেনে চললেই ৬০% সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তাই, নীতি নির্ধারকদের এবং আমাদের উচিত সচেতন হওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।